Hi

০৩:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বনভূমির জমি দখল ও ‘দাগ’ বিক্রির অভিযোগে দুইজন গ্রেপ্তার

  • সাহেদ উদ্দিন
  • আপডেট : ০৩:১০:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২ জন দেখেছে

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার সুখচর সংলগ্ন মেঘনা নদীর বুকে সম্প্রতি জেগে ওঠা জাগলার চরে বন বিভাগের জমি দখল, বনাঞ্চল উজাড়, সরকারি জমি বেচাকেনা এবং ভূমিহীন মানুষের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বন বিভাগের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাগলার চর এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্তদের আটক করা হয়। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তাদের নোয়াখালীর বিচারিক আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন উপজেলার সুখচর ইউনিয়নের উত্তর শূল্যকিয়া এলাকার মৃত আবুল খায়েরের ছেলে মো. এনায়েত হোসেন ওরফে এনায়েত খলিফা (৫৬) এবং চরকিং ইউনিয়নের কলাপাড়া এলাকার মৃত খবির উদ্দিনের ছেলে মো. রুবেল (৩০)।

বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা জাগলার চরকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরে একটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চলের বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন জমি নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই চক্রের সদস্যরা বন বিভাগের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে বসতি স্থাপন, গাছপালা কেটে বনভূমি উজাড় এবং জমির কৃত্রিম সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু করে।

এছাড়া তারা বিভিন্ন এলাকার ভূমিহীন, অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সরকারি বন্দোবস্তের নামে জমি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায় করছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কথিত দালাল ও এজেন্টদের মাধ্যমে অনেক মানুষের কাছ থেকে নগদ টাকা সংগ্রহ করা হয়। তাদের বলা হয়, জাগলার চরের নির্দিষ্ট জমি বা ‘দাগ’ তাদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হবে। বাস্তবে এসব জমি বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি সম্পত্তি হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি বা বন্দোবস্ত দেওয়ার কোনো আইনগত সুযোগ নেই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জমি পাওয়ার আশায় অনেক ভূমিহীন পরিবার নিজেদের সঞ্চিত অর্থ কিংবা ধার-দেনা করে টাকা দিয়েছেন। পরবর্তীতে তারা জানতে পারেন, এসব জমি বৈধভাবে হস্তান্তর বা বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। ফলে প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

বিষয়টি বন বিভাগের নজরে এলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং অবৈধ দখলদারদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এ সময় বন বিভাগের কর্মকর্তারা জমি দখল ও বনাঞ্চল উজাড়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হয় এবং তাদের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করা হয়। এমনকি আক্রমণের চেষ্টার ঘটনাও ঘটে বলে বন বিভাগের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর বন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রায় ২০ জনকে আসামি করে হাতিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় সরকারি জমি দখল, বনভূমি বিনষ্ট, সরকারি কাজে বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রতারণাসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুইজনকে গ্রেপ্তার করে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীতে নতুন চর জেগে উঠলে প্রায়ই সেখানে জমি দখলকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের তৎপরতা শুরু হয়। অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ চক্র ভূমিহীন মানুষের আবেগ ও প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে জমি দেওয়ার নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। জাগলার চরেও একই ধরনের কার্যক্রম চলছিল বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।

হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কবির হোসেন বলেন, বন বিভাগের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি জমি দখল, সরকারি কাজে বাধা প্রদান, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এবং তদন্তে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, সরকারি কিংবা বন বিভাগের জমি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি বা বন্দোবস্ত দিতে পারে না। এ ধরনের প্রলোভনে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জমি দেওয়ার নামে কেউ অর্থ দাবি করলে বা প্রতারণার চেষ্টা করলে দ্রুত প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করতে হবে। সরকারি সম্পদ রক্ষা এবং সাধারণ মানুষকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, জাগলার চরের মতো নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চলে সরকারি নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভূমিহীন মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এ ধরনের ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।

জনপ্রিয়

বনভূমির জমি দখল ও ‘দাগ’ বিক্রির অভিযোগে দুইজন গ্রেপ্তার

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি © FeniVoice24
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ Noa Super It

You cannot copy content of this page

বনভূমির জমি দখল ও ‘দাগ’ বিক্রির অভিযোগে দুইজন গ্রেপ্তার

আপডেট : ০৩:১০:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার সুখচর সংলগ্ন মেঘনা নদীর বুকে সম্প্রতি জেগে ওঠা জাগলার চরে বন বিভাগের জমি দখল, বনাঞ্চল উজাড়, সরকারি জমি বেচাকেনা এবং ভূমিহীন মানুষের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বন বিভাগের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাগলার চর এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্তদের আটক করা হয়। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তাদের নোয়াখালীর বিচারিক আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন উপজেলার সুখচর ইউনিয়নের উত্তর শূল্যকিয়া এলাকার মৃত আবুল খায়েরের ছেলে মো. এনায়েত হোসেন ওরফে এনায়েত খলিফা (৫৬) এবং চরকিং ইউনিয়নের কলাপাড়া এলাকার মৃত খবির উদ্দিনের ছেলে মো. রুবেল (৩০)।

বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা জাগলার চরকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরে একটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চলের বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন জমি নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই চক্রের সদস্যরা বন বিভাগের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে বসতি স্থাপন, গাছপালা কেটে বনভূমি উজাড় এবং জমির কৃত্রিম সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু করে।

এছাড়া তারা বিভিন্ন এলাকার ভূমিহীন, অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সরকারি বন্দোবস্তের নামে জমি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায় করছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কথিত দালাল ও এজেন্টদের মাধ্যমে অনেক মানুষের কাছ থেকে নগদ টাকা সংগ্রহ করা হয়। তাদের বলা হয়, জাগলার চরের নির্দিষ্ট জমি বা ‘দাগ’ তাদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হবে। বাস্তবে এসব জমি বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি সম্পত্তি হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি বা বন্দোবস্ত দেওয়ার কোনো আইনগত সুযোগ নেই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জমি পাওয়ার আশায় অনেক ভূমিহীন পরিবার নিজেদের সঞ্চিত অর্থ কিংবা ধার-দেনা করে টাকা দিয়েছেন। পরবর্তীতে তারা জানতে পারেন, এসব জমি বৈধভাবে হস্তান্তর বা বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। ফলে প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

বিষয়টি বন বিভাগের নজরে এলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং অবৈধ দখলদারদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এ সময় বন বিভাগের কর্মকর্তারা জমি দখল ও বনাঞ্চল উজাড়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হয় এবং তাদের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করা হয়। এমনকি আক্রমণের চেষ্টার ঘটনাও ঘটে বলে বন বিভাগের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর বন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রায় ২০ জনকে আসামি করে হাতিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় সরকারি জমি দখল, বনভূমি বিনষ্ট, সরকারি কাজে বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রতারণাসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুইজনকে গ্রেপ্তার করে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীতে নতুন চর জেগে উঠলে প্রায়ই সেখানে জমি দখলকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের তৎপরতা শুরু হয়। অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ চক্র ভূমিহীন মানুষের আবেগ ও প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে জমি দেওয়ার নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। জাগলার চরেও একই ধরনের কার্যক্রম চলছিল বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।

হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কবির হোসেন বলেন, বন বিভাগের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি জমি দখল, সরকারি কাজে বাধা প্রদান, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এবং তদন্তে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, সরকারি কিংবা বন বিভাগের জমি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি বা বন্দোবস্ত দিতে পারে না। এ ধরনের প্রলোভনে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জমি দেওয়ার নামে কেউ অর্থ দাবি করলে বা প্রতারণার চেষ্টা করলে দ্রুত প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করতে হবে। সরকারি সম্পদ রক্ষা এবং সাধারণ মানুষকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, জাগলার চরের মতো নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চলে সরকারি নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভূমিহীন মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এ ধরনের ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।