
নিজস্ব প্রতিবেদক | ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার ব্যস্ততম আনন্দপুর বাজারের উপকণ্ঠে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন তিন শতাধিক পরিবারের মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের ড্রেনের একটি অংশ দখল করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা এবং কালভার্টের মুখ বন্ধ থাকায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যাচ্ছে বসতবাড়ি, উঠান ও চলাচলের সড়কে। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দুই বছর ধরে এ দুর্ভোগ চললেও এখন পর্যন্ত এর কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত কয়েকদিনে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম হলেও আনন্দপুর বাজারের উপকণ্ঠের ওই এলাকায় বাড়িঘরের আশপাশ, উঠান ও চলাচলের সড়কে পানি জমে রয়েছে। কোথাও হাঁটুসমান পানি, আবার কোথাও কাদা ও ময়লা-আবর্জনায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সড়ক। দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় বিভিন্ন স্থানে পানিতে ফেনা ও ময়লা-আবর্জনা ভাসতে দেখা যায়।
জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি একটি পরিবার জলাবদ্ধতার কারণে অন্যত্র বাসা নিয়ে চলে গেছে বলেও জানান তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল (৩২) বলেন, “দুই বছর ধরে বর্ষা এলেই আমাদের এই সমস্যায় পড়তে হয়। পানি যাওয়ার পথ বন্ধ থাকায় বৃষ্টি থামার পরও পানি সহজে নামতে চায় না। বাড়ি থেকে বের হওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে।”
আলম ভূঞা বলেন, “এখানে শ’দুয়েক পরিবার বসবাস করে। বর্ষার সময় ঘরবাড়ির চারপাশ পানিতে ডুবে থাকে। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে চলাফেরা করতে হয়। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ঠিক করা হলে আমাদের এই দুর্ভোগ থাকত না।”
নেজাম পাটোয়ারীর অভিযোগ, “ড্রেন দিয়ে পানি যাওয়ার কথা থাকলেও পানি ঠিকমতো যেতে পারে না। কালভার্টের মুখও বন্ধ হয়ে আছে। এ কারণে একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। বিষয়টি দীর্ঘদিনের হলেও এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।”
স্থানীয় বাসিন্দা শুভ বলেন, “বাজারের পাশে এমন একটি এলাকায় দিনের পর দিন পানি জমে থাকা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। প্রশাসনের উচিত সরেজমিনে এসে কোথায় সমস্যা হচ্ছে তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।”
ফিরোজা বেগম বলেন, “নারী ও শিশুদের জন্য এই পানির মধ্যে চলাচল করা খুব কষ্টকর। কেউ অসুস্থ হলে তাকে নিয়ে বাইরে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় মনে হয়, বাড়িতে থেকেও আমরা পানিবন্দি অবস্থায় আছি।”
সোবহান ভূঞা বলেন, “আগে বাড়ির উঠানে ধান শুকানোসহ নানা কাজ করা যেত। এখন দীর্ঘসময় পানি জমে থাকে। ঘরের চারপাশ ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে থাকায় বসবাসের পরিবেশও নষ্ট হয়ে গেছে।”
হান্নান সরকার বলেন, “আমরা সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান চাই। শুধু পানি সরিয়ে দিলেই হবে না; ভবিষ্যতে যাতে পানি জমতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। ড্রেন ও কালভার্টের পানি চলাচলের পথ দ্রুত সচল করা জরুরি।”
ড্রেন ও কালভার্ট নিয়ে অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ পানি নিষ্কাশনের ড্রেন ও একটি কালভার্ট। তাঁদের দাবি, ড্রেনের একটি অংশ দখল করে ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে কালভার্টের মুখ বন্ধ থাকায় পানি স্বাভাবিকভাবে বের হতে পারছে না। ফলে বৃষ্টির পানি জমে থাকছে বসতবাড়ি ও চলাচলের রাস্তায়।
তবে ড্রেন দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। তিনি বলেন, “এটি ঠিক নয়। আমার থেকে অনেক দূরে কালভার্ট। আমরা সি অ্যান্ড বি’র সঙ্গে কথা বলেছি। দু-একদিনের মধ্যেই ড্রেনের ব্যবস্থা করা হবে।”
তবে অভিযুক্তের বক্তব্যের পরও স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরেজমিনে পানি নিষ্কাশনের পুরো পথ পরিদর্শন করা হলে প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। তাঁদের মতে, শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থানে নয়, পানি প্রবাহের পুরো ব্যবস্থায় কোথাও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় আশপাশের পুকুর ও জলাশয়ের পানিও দূষিত হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পানিতে ফেনা ও ময়লা জমার পাশাপাশি বেড়েছে মশার উপদ্রব। এতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জলাবদ্ধতার কারণে শুধু চলাচল নয়, তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বিভিন্ন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। আগে যেসব উঠানে ধান শুকানো, শিশুদের খেলাধুলা কিংবা পারিবারিক নানা কাজ হতো, সেসব স্থান এখন দীর্ঘসময় পানির নিচে থাকছে।
এ বিষয়ে ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাউছার হামিদ বলেন, “ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়রা বলছেন, সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে দিলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাঁদের দাবি, ড্রেন ও কালভার্টের মুখ পরিষ্কার করা, পানি প্রবাহের পথ সচল রাখা এবং কোথাও দখল বা প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা অপসারণের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সড়ক ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা দপ্তরগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপও প্রয়োজন।
তিন শতাধিক পরিবারের প্রায় দুই বছরের এই দুর্ভোগ এখন আর শুধু বর্ষাকালের সাময়িক জলাবদ্ধতা নয়; এটি এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার চিত্রও সামনে এনেছে।
রিপোর্টার নাম: 









